জুলাই ১৯, ২০২৪ ৩:০০ পূর্বাহ্ণ

তেল সাশ্রয়ী এসপিএম প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে

 

 

উপল রহিম।

শেষপর্যায়ে রয়েছে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) এবং ডাবল পাইপলাইন’ প্রকল্পের নির্মাণকাজ। আমদানি করা জ্বালানি তেল জাহাজ থেকে দ্রুত এবং সাশ্রয়ীভাবে খালাসের জন্য নেয়া এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় তেল খালাস করা সম্ভব হবে। বর্তমানে জাহাজ থেকে তেল খালাসে সময় লাগে ১১ দিন। প্রকল্পটির মাধ্যমে তেল মজুদের সক্ষমতা বাড়বে। সময় কমে আসায় বছরে সাশ্রয় হবে কমপক্ষে ৮০০ কোটি টাকা। বতর্মানে প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ৯৪ শতাংশ।
জানা গেছে, আমদানি করা তেল প্রথমে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পৌঁছায়। সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পৌঁছে যায় রিফাইনারি ট্যাংকে। এতে একলাখ টন ধারণক্ষমতার জাহাজ থেকে তেল খালাস করতে লাগে ১১ দিন। গুনতে হয় সেই ১১ দিনের জাহাজভাড়া। এর সঙ্গে রয়েছে অপচয় ও অনিয়ম। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) বাস্তবায়নাধীন এসপিএম প্রকল্প চালু হলে একলাখ টন ক্ষমতার জাহাজ থেকে তেল খালাস করতে লাগবে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। জাহাজভাড়া, অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ হলে এ ক্ষেত্রে বিপুল অর্থের সাশ্রয় হবে।

 

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত জানান, আগামী মার্চের আগে প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হতে পারে। ইতোমধ্যে প্রকল্পে ৯৪ শতাংশের মতো কাজ শেষ হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ১৪৬ কিলোমিটার পাইপলাইনের মধ্যে ১১০ কিলোমিটারের কাজ শেষ। ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে ৭৪ কিলোমিটার পাইপলাইনের কাজও শেষপর্যায়ে।

 

‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং এবং ডাবল পাইপলাইন’ নির্মাণ হচ্ছে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী দ্বীপের কাছে। প্রায় ৯০ একর জায়গা নিয়ে প্রকল্পের জন্য ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হচ্ছে। এর তিনটি পরিশোধিত তেল মজুদের জন্য আর তিনটি অপরিশোধিত তেলের জন্য। প্রতিটি পরিশোধিত স্টোরেজ ট্যাংকারের ধারণক্ষমতা ৬০ হাজার ঘনমিটার। অপরিশোধিত স্টোরেজ ট্যাংকারের ধারণক্ষমতা ৩৫ হাজার ঘনমিটার। সাধারণত জাহাজ থেকে ক্রুড অয়েল ও ফিনিশড পণ্য সরাসরি ভেসেল মুরিং পয়েন্টে চলে যাবে। সেখান থেকে পাম্প করে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রথমে তেল আনা হবে মহেশখালীর স্টোরেজ ট্যাংকে। সেখান থেকে আবার পাম্পের মাধ্যমে পাইপ লাইনে করে পাঠানো হবে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। এসপিএম প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমদানি করা অপরিশোধিত বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল খালাস সহজ করার পাশাপাশি লাইটারিং অপারেশন ব্যয় কমানো, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে বর্তমান রিফাইনারির প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা বাড়ানো, বছরের ক্রুড অয়েল পরিশোধন ক্ষমতা ১ দশমকি ৫ মিলিয়ন মেট্রিকটন থেকে ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন মেট্রিকটনে উন্নীত করা। তাছাড়াও ইআরএল এর জরুরি শাটডাউনের ব্যাকআপ হিসেবে মহেশখালীতে ট্যাংক ফার্ম স্থাপন এবং পরিশোধিত তেল মজুদ ও সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

 

 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গত আগস্টে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ।
দেশে জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৫ মিলিয়ন টন হাই স্পিড ডিজেল আমদানি করতে হয়। এছাড়া আন্তঃদেশীয় ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ায় আরও বেশি পরিমাণ তেল আমদানির প্রয়োজন পড়বে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলের নাব্যতা কম হওয়ায় মাদার অয়েল ট্যাংকারগুলো সরাসরি খালাস করা সম্ভব হয় না। যার ফলে এসব ট্যাংকার গভীর সমুদ্রে নোঙ্গর করে ছোট ছোট লাইটারেজ ভেসেলের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল খালাস করা হয়। গতানুগতিক এই পদ্ধতি সময়সাপেক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ আর ব্যয়বহুলও। যে কারণে গভীর সমুদ্রে মুরিং পয়েন্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সঙ্গে ডাবল পাইপলাইন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। ২০১৫ সালে নেওয়া প্রকল্পটি তিন বছরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটিতে মূল অনুমোদিত ব্যয় নির্ধারিত ছিল ৪ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। এতে চায়না এক্সিম ব্যাংকের ঋণ ছিল ৪ হাজার ৬৮৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আর এই ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ছিল ৫ বছর। সে অনুযায়ী চুক্তির দিন থেকে পরবর্তী ৫ বছর পর ঋণ পরিশোধ শুরু করতে হবে চীনকে। কিন্তু দুই দফায় ব্যয় ও সময় বেড়েছে প্রকল্পের। তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হলেও এপ্রিল থেকেই ঋণ পরিশোধ শুরু করতে হবে। এদিকে তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকায়। বর্তমানে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে পরিশোধন ক্ষমতা ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এসপিএম প্রকল্পটি পরিশোধন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। ফলে জ্বালানি তেলের মজুত ও সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং জোগানের নিরাপত্তা বাড়বে

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn