এপ্রিল ১৭, ২০২৪ ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ

বহিষ্কার করা হয়েছে ৭ ছাত্রলীগকর্মীকে

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) প্রধান ছাত্রাবাসে চার শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত সাত ছাত্রলীগ কর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করেছে কলেজ প্রশাসন। অভিযুক্ত সাতজনের মধ্যে একজনকে তিন বছর, তিনজনকে দুই বছর এবং বাকি তিনজনকে দেড় বছরের জন্য মেডিকেল কলেজের সকল ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চমেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. সাহেনা আক্তারের সভাপতিত্বে কলেজের সম্মেলন কক্ষে একাডেমিক কাউন্সিলের এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ছাত্রাবাসে চার শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় গঠিত ৯ সদস্যের কমিটি।

কমিটির আহ্বায়ক ও চমেক উপাধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. হাফিজুল ইসলাম এবং সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে কমিটি তাদের প্রতিবেদন অধ্যক্ষের হাতে জমা দেন। তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েই জরুরি ভিত্তিতে দুুপুর একটায় একাডেমিক কাউন্সিলের সভা আহ্বান করেন চমেক অধ্যক্ষ। বিশদ আলোচনা–পর্যালোচনার পর সর্বসম্মতিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাসহ একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে একাডেমিক কাউন্সিলে। চমেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. সাহেনা আক্তার এসব সিদ্ধান্তের তথ্য আজাদীকে নিশ্চিত করেছেন। এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরপরই গতকাল বিকেল থেকে ছাত্রাবাস ও কলেজ ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের এ সিদ্ধান্ত একাডেমিক কাউন্সিলেই নেয়া হয় বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ।

জড়িতরা কে কোন মেয়াদে বহিষ্কার : গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রধান ছাত্রাবাসে সংঘটিত ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হিসেবে ৭ জনের নাম উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। অভিযুক্ত ৭ জনের মধ্যে অভিজিৎ দাশ ও মো. রিয়াজুল ইসলাম জয় এমবিবিএস ৫৯ তম ব্যাচের। বাকি ৫ জন ৬২ তম ব্যাচের। তারা হলেন– সাজু দাশ, সৌরভ দেব নাথ, মাহিন আহমেদ, জাকির হোসেন সায়েল ও মো. ইব্রাহিম খলিল সাকিব।

অভিযুক্তদের মাঝে অভিজিৎ দাশকে তিন বছর, মো. রিয়াজুল ইসলাম জয়, সাজু দাশ ও সৌরভ দেব নাথকে দুই বছর করে এবং মাহিন আহমেদ, জাকির হোসেন সায়েল ও মো. ইব্রাহিম খলিল সাকিবকে দেড় বছরের জন্য মেডিকেল কলেজের সকল ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এর আগে ২০২১ সালের ২৯ ও ৩০ অক্টোবর চমেক হোস্টেল ও ক্যাম্পাসে সংঘটিত ছাত্রলীগের দুগ্রুপের মারামারির ঘটনায় বিভিন্ন মেয়াদে ৩১ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে চমেক প্রশাসন। বহিষ্কৃতদের তালিকায় এই সাতজনও ছিলেন। এর মাঝে অভিজিৎ দাশ দুই বছরের জন্য এবং মো. রিয়াজুল ইসলাম জয় দেড় বছরের জন্য বহিষ্কৃত হয়। আর সাজু দাশ, সৌরভ দেব নাথ, মাহিন আহমেদ, জাকির হোসেন সায়েল ও মো. ইব্রাহিম খলিল সাকিব বহিষ্কার হয়েছিলেন এক বছরের জন্য। এরা ৭ জনই চমেক ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

হোস্টেলে অবৈধভাবেই থাকছিলেন অভিযুক্তরা : ২০২১ সালের দুই গ্রুপের মারামারির পর থেকে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ রেখেছে চমেক প্রশাসন। পরে বহিষ্কৃতদের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের শাস্তি স্থগিত করে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। তবে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়ার সুযোগ দিলেও বহিষ্কৃতদের হোস্টেলে সিট বরাদ্দ দেয়া হয়নি। কিন্তু তারা ছাত্রাবাসেই থাকতেন। অভিযুক্তরা অবৈধভাবেই ছাত্রাবাসে থাকছিলেন জানিয়ে চমেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. সাহেনা আক্তার আজাদীকে বলেন, এদের আগের শাস্তি কিন্তু মওকুফ করা হয়নি। স্থগিত রেখে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। হোস্টেলে তাদের সিট বরাদ্দ দেয়া হয়নি। অবৈধভাবেই তারা হোস্টেলে রুম দখল করে ছিল।

তারা বিশৃঙ্খলা করবে না বলে মুচলেকাও দিয়েছিল। কিন্তু তারা সে মুচলেকাও ভঙ্গ করেছে। নতুন করে অপরাধে জড়িয়েছে। সবমিলিয়ে সর্বসম্মতিতে বৃহস্পতিবার একাডেমিক কাউন্সিলে শাস্তিমূলক এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বহিষ্কারের পাশাপাশি অভিযুক্ত এই ৭ শিক্ষার্থীকে হোস্টেল ও কলেজ ক্যাম্পাসে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার (গতকাল) থেকেই কার্যকর বলে বিবেচ্য হবে বলে চমেক অধ্যক্ষ নিশ্চিত করেছেন।

আরো একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত : অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আরো একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত চমেকের একাডেমিক কাউন্সিলে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে– অভিযুক্ত সাত শিক্ষার্থীর অভিভাবককে ডেকে এনে কঠোরভাবে সতর্ক করা, ছাত্রাবাসে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানোর লক্ষ্যে একজন হোস্টেল সুপারের পরিবর্তে প্রধান ছাত্রাবাসে একাধিক হোস্টেল সুপারকে দায়িত্ব প্রদান, প্রধান ছাত্রবাসের মূল ফটকসহ সম্পূর্ণ ছাত্রাবাস সিসিটিভির আওতায় আনা, প্রধান ছাত্রাবাসে আগত সকল বহিরাগত ও অতিথিদের নাম রেজিস্ট্রারে তালিকাভুক্ত করা, প্রতিবছর ছাত্র–ছাত্রীদের অভিভাবকের সঙ্গে প্যারেন্টস মিটিং আয়োজন, ছাত্র এবং ছাত্রী হোস্টেলে কর্মকাণ্ড নজরদারির জন্য শিক্ষক–চিকিৎসকের সমন্বয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিজিলেন্স টিম গঠনের সিদ্ধান্ত অন্যতম। এছাড়া পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত ছাত্রাবাস সমূহ ও কলেজ ক্যাম্পাস পুলিশ প্রশাসনের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে যেকোনো পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে কোনো শিক্ষার্থীকে বা তার কক্ষে তল্লাশিসহ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।

একাডেমিক কাউন্সিলে অংশ নেয়া একাধিক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজাদীকে বলেছেন, মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে সংঘাতের একটি দুষ্টুচক্র ভর করেছে। কঠোর প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেই কলেজ প্রশাসনকে এই চক্র ভাঙতে হবে। কারণ, রাজনীতির সম্পৃক্ততায় গুটি কয়েক বিশৃঙ্খল শিক্ষার্থীর হাতে এভাবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হতে দেয়া যায় না। এই সিদ্ধান্তে একাডেমিক কাউন্সিলের সকল সদস্য একমত পোষণ করেছেন বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি অভিভাবকের : নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নির্যাতনের শিকার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আবু জামাল। তিনি নির্যাতনের শিকার চমেক শিক্ষার্থী আবু রাইয়াতের বাবা। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। তবে শাস্তির খবরে স্বস্তি প্রকাশ করলেও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn