এপ্রিল ১৪, ২০২৪ ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ

আসন্ন বর্ষায় ভোগান্তি কমবে চট্টগ্রামে

জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পের সিংহভাগ কাজ শেষ হওয়ায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নগরবাসীর ভোগান্তি কম হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া প্রকল্পভুক্ত খালগুলোতে কাজের সুবিধার্থে দেয়া বাঁধ ও মাটি অপসারণ করা হয়েছে। তাই খালের কারণে এবার কোথাও জলাবদ্ধতা হবে না। তবে প্রকল্পের বাইরে থাকা শহরের অনেকগুলো ড্রেন এখনো ভরাট রয়েছে। যেগুলো পরিষ্কার না করায় ড্রেন সংশ্লিষ্ট এলাকার পানি খালে আসতে বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রভাবে কোথাও জলাবদ্ধতার শঙ্কা রয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সমপ্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ আশা এবং শঙ্কার কথা জানানো হয়।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে দামপাড়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের সম্মেলন কক্ষে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ, সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাসুদুর রহমান। প্রকল্পের উদ্দেশ্য, অগ্রগতি, জলাবদ্ধতার কারণ ও বাধা বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য–উপাত্ত উপস্থাপন করেন বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী।

সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, খালে ময়লা ফেললে সিটি কর্পোরেশন আইনে শাস্তি দেয়ার বিধান আছে। ওনারা যদি ব্যবস্থা নেন তাহলে ময়লা ফেলা বন্ধ হবে। এছাড়া জনসাধারণকেও এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। প্রকল্পের কাজের সুবিধার্থে ইতোমধ্যে দেয়া বাঁধ সরানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, রাস্তার ড্রেনগুলো যদি পরিষ্কার থাকে তাহলে খালে পানি আসবে না। যে যে সংস্থার অধীনে আছে তারা পরিষ্কার করবে। তিনি বলেন, আমাদের খাল পরিষ্কার আছে। ড্রেনে বাধার জন্য খালে পানি না এসে হয়তো জলাবদ্ধতা হবে এবার।

এসময় সাংবাদিকরা ড্রেন পরিষ্কার না করার জন্য সিটি কর্পোরেশনকে দোষারোপ করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, কাউকে দোষারোপ করছি না। এক সংস্থা অন্য সংস্থাকে ব্লেইম করে জনগণকে কষ্ট দেয়া যাবে না। জনগণের সুবিধার জন্য সবাইকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব আছে। সেনাবাহিনী যে অংশে কাজ করছে সেখানে মাটি থাকলে তারা তুলে দিবে। একইভাবে সিটি কর্পোরেশনের অংশে মাটি থাকলে তারা পরিষ্কার করে দিবে।

তিনি বলেন, মেগা প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১টি খাল নিয়ে সিটি কর্পোরেশন প্রকল্প নিবে। স্লুইচ গেট এর কাজ শেষ হওয়ায় আগ্রাবাদ এলাকায় এবার জলাবদ্ধতা হবে না বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, আগে সমন্বয়ের অভাব ছিল। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর সিটি কর্পোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় সভা করি। এরপর ২০১৯ সাল থেকে মূল কাজ আরম্ভ হয়।

সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তিন বছরে যে কাজ করেছে তা অন্য সংস্থা করলে ১৩ বছর লাগত। এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এ প্রকেল্পর বাইরেও কিন্তু আরো কাজ আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড করছে। সিডিএর আরেকটি প্রকল্পেও জলাবদ্ধতার কিছু অংশ আছে। সব কাজ শেষ হলে চট্টগ্রামবাসী জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে আশা করি।

সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাসুদুর রহমান বলেন, আমাদের কাজ প্রায় সিংহভাগ শেষ। এর সুফল হিসেবে আগের মত জলাবদ্ধতা হবে না।

তিনি বলেন, খাল আছে ৫৭ টি। আমরা কাজ করছি ৩৬ টির। ২১টি কিন্তু বাদ আছে। ওই খালগুলোর কি অবস্থা আপনাদের (সাংবাদিকদের উদ্দেশে) একটু সরেজমিন দেখতে হবে। আমাদের প্রকল্পের কারণে যে চট্টগ্রাম ডুবে যাচ্ছে, ব্যাপারটা তা না। যেহেতু আমাদের প্রকল্পের সিংহভাগ কাজ শেষ তাই সুফল আসবে। কিন্তু সবার সহযোগিতা লাগবে।

খাল পরিষ্কার করার কিছুদিনের মধ্যেই আবার ময়লা এসে জমে যায় উল্লেখ করে বলেন, মানুষ যদি সচেতন না হয় প্রকল্পের সুফল পাওয়া যাবে না। সবাই হাত ধরাধরি করে সবাইকে সচেতন করে যদি কাজ করতে পারলে প্রকল্পের সুফল পাব।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের কিছু জায়গায় দেখলাম পানিতে ডুবে গেছে। কিন্তু তখন খালে পানি ছিল না। সাধারণত খাল পানিতে ভরা থাকলেই পাশের জায়গা ডুবে থাকার কথা। এখানে হয়েছে কি ওসব এলাকার পানি খালে যায়নি। কারণ হচ্ছে ছোট ছোট যে ড্রেন সেগুলো ব্লক হয়ে আছে। বর্ষার আগে ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা উচিত। অন্যতায় আমরা সুফল পাব না। যে অর্গানাইজেশনের যেটা দায়িত্ব সেটা যদি করি তাহলে এ বছর থেকেই ভালো একটা রেজাল্ট পাওয়া যাবে। হয়তো সম্পূর্ণ রেজাল্ট এবছর পাব না, আরো অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু ভালো রেজাল্ট এ বছর পাব ইনশাল্লাহ। আমাদের ভোগান্তির দিন হয়তো একটু একটু কমে আসছে।

বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ সফলভাবে শেষ করলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প’র মতো চালেঞ্জ কোথাও পড়তে হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে এটা অনেক জটিল একটা প্রকল্প। বাস্তবতা হচ্ছে আমরা বছরে মাত্র ছয় মাস কাজ করতে পারি। যেমন এবার রোযার শেষের দিকে এসে কাজ শেষ বন্ধ করে ফেলেছি। কারণ কাজ করতে গেলে খালে বাঁধ দিতে হয়। এতে বৃষ্টি এলেই মানুষের ভোগান্তি হয়। সেটাকে আমরা বিবেচনায় নিয়ে কাজ বন্ধ করে সবগুলো খাল পরিষ্কার করেছি।

তিনি বলেন, আমাদের দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল অনেক জায়গা বেদখল হয়ে যাওয়া। জায়গা খালি থাকলে সহজে কাজ শুরু করা যায়। কিন্তু দখলমুক্ত করে কাজ শুরু করতে গেলে কিছুটা স্লো হয়ে যায়। যেমন খন্দকিয়া খালে একটা শ্মশানঘাট রয়েছে। অন্যস্থানে একটা মসজিদ। আসলে এগুলো অনুভূতির জায়গা। সবাইকে সাথে নিয়েই তো কাজ করতে হবে। কাউকে মনে কষ্ট দেয়া যাবে না। এরকম আরো প্রচুর চ্যালেঞ্জ আছে।

তিনি বলেন, কালভার্টের নিচ দিয়ে কোনো সংস্থা একটা পাইপ নিয়ে গেল। ওই পাইপটা সরাতে গেলে তাদের অনুমোদন নিতে হয়। কিছুদিন আগে মুরাদপুরে কালভার্ট করার সময় ইউটিলিটি সিস্টেম চেঞ্জ করতে প্রায় ছয় মাস দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। অথচ কালভার্টটা করতে সময় লেগেছে মাত্র দেড় মাস। তার মানে একট দেড় মাসের কাজ করার জন্য আমাদের ছয় মাস ছোটাছুটি করতে হয়েছে। এ রকম বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ আছে। সেগুলো মোকাবেলা করে প্রকল্প আগাচ্ছে।

‘খাল পরিষ্কারের পরও ময়লায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এ ময়লা অপসারণের দায়িত্ব কোন সংস্থার?’ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণলায়ে বেশ কয়েকটি মিটিং হয়েছে। খালের কাজ শেষ হয়ে গেলে তাদের খাল বুঝিয়ে দেয়াসহ কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা রেগুলেটরের কাজ শেষ করলাম। কিন্তু অপারেটর না থাকলে চালাবে কে? তাদের প্রশিক্ষণের ব্যাপার আছে। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত আছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার হিসাব মতে খালে মাটি নাই। কারণ এ মাটি অপসারণ কাজ আমরা রোযার আগে থেকে শুরু করেছি। আমাদের যে ৩৬ খাল সেখানে কোথাও মাটি দেখলে জানান, আমরা ওইদিনই তুলে ফেলব। এখানে গেম ব্লেইমের কিছু নাই। আমি আপনাকে দায় দিচ্ছি, আপনি আমাকে দায় দিচ্ছেন। মানুষকে কষ্ট দিয়ে গেম ব্লেইমের পক্ষপাতি না। আমরা মানুষকে কষ্ট দিতে চাই না। আমরা কাউকে দায়ি দিতে চাই না। যার যে কাজ সেটি করলেই হয়ে যায়। ময়লা পরিষ্কার যার কাজ তারাই মেকানিজম ডেভেলাপ করবে। আমরা তো প্রকল্পের কাজ শেষ করে চলে যাব। প্রকল্প তো অস্থায়ী। কিন্তু যে স্থায়ী তারই মেকানিজম ডেভেলপমেন্ট করা উচিত।

‘খালে দেয়া বাঁধ ও মাটি অপসারণ না করলে এবার বর্ষায় কোমর সমান পানি হতে পারে।’ সিটি মেয়রের এমন বক্তব্যে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, খালে মাটি থাকলেই না কোমর সমান পানি হবে। এখন তো মাটি নাই।

মেগা প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১ টি খাল আরডিপিপি’তে অর্ন্তভুক্ত করা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা পকিল্পনা করছিলেন তারাই বেসিক ৩৬ খাল ধরে ডিপিপি করে। আমাদের হাতে প্রজেক্ট আসছে আরো একবছর পর। আমাদের যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেখানেই ফোকাস দিয়েছি।

জমি অধিগ্রহণের জন্য কিছু কাজ বাকি আছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান জমি অধিগ্রহণে সরকার নির্ধারিত যে দাম তা প্রকল্পে যা ধরা আছে তার চেয়ে অনেক বেশি। এখন তিনগুণ দিতে হয়। প্রকল্পে অত টাকা ধরা ছিল না।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn