এপ্রিল ১৬, ২০২৪ ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ

রোববার আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড়

৫১টি সম্ভাব্য গতিপথ, ঝুঁকিতে কক্সবাজার উপকূল

চট্টলার কণ্ঠ প্রতিবেদন।

আগামী রোববার চট্টগ্রাম বিভাগে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’। বিদ্যমান গতিপথ অনুযায়ী এটি কক্সবাজার ও মিয়ানমারের কিয়াউকপিউয়ের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

অবশ্য গত রাত ১১টায় এ রিপোর্ট লেখার সময়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়নি দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ আন্দামান সাগরে অবস্থানরত ‘গভীর নিম্নচাপ’টি। তবে রাতের মধ্যেই এটি ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’য় পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করে আবহাওয়াবিদগণ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইন্টিগ্রেটেড ফোরকাস্টিং সিস্টেম নামক আবহাওয়া মডেলে ‘মোখা’র ৫১টি সম্ভাব্য গতিপথ রয়েছে ‘মোখা’র। যার বেশিভাগ নির্দেশিত পথ অনুযায়ী, ‘মোখা’ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উপর দিয়ে স্থল ভাগে আঘাত করার সম্ভবনা বেশি। এক্ষেত্রে কক্সবাজারের সেন্টমার্টি দ্বীপ, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, ও মহেশখালী উপজেলার উপর দিয়ে ‘মোখা’ অতিক্রম করার সম্ভবনা বেশি বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদগণ।

আবহাওয়া অফিস জানায়, গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় গভীর নিম্নচাপ কেন্দ্রের ৪৮ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্ব্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া ‘গভীর নিম্নচাপটি’ গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৪২০ কিলোমিটার দক্ষিণে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণ–দক্ষিণপূর্বে অবস্থান করছিল। এটি আরো ঘণীভূত হয়ে উত্তর–উত্তরপশ্চিম দিকে এবং পরবর্তীতে দিক পরিবর্তন করে ক্রমান্বয়ে উত্তর–উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হতে পারে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে জানানো হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়, গভীর নিম্নচাপ কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর উত্তাল রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ০১ নম্বর (০১ নম্বর দূরবর্তী সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে। এতে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। সেইসাথে তাদেরকে গভীর সাগরে বিচরণ না করতে বলা হয়।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ মে রাতে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ আন্দামান সাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। যা ৮ মে রাতে সু–স্পষ্ট লঘুচাপে এবং ৯ মে ‘নিম্নচাপে পরিণত হয়। গতকাল সকালে আরো শক্তিশালী হয়ে তা গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়।

উল্লেখ্য, আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয় বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সাইক্লোন সংক্রান্ত আঞ্চলিক সংস্থা এসকাপ। এ অঞ্চলের ১৩টি দেশের দেওয়া নামের তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে নতুন নতুন ঘূর্ণিঝড়ের নাম ঠিক করা হয়। মোখা নামটি ইয়েমেনের দেয়া।

ঝুঁকিতে কক্সবাজার : কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ গত রাত ৮টায় আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে জানান, ঘূর্ণিঝড় মোখার অগ্রভাগ আগামী রোববার সকাল ৬ টার পর থেকে দুপুর ১২ টার মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলে আঘাত করার আশংকা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ও পিছনের অংশ সন্ধ্যা থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত উপকূল অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উপর দিয়ে স্থল ভাগে মোখা আঘাত করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা আছে। ঘূর্ণিঝড় মোখা এর কেন্দ্র কক্সবাজার জেলার সেন্টমার্টি দ্বীপ, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, ও মহেশখালী উপজেলার উপর দিয়ে অতিক্রম করার প্রবল আশংকা রয়েছে। টেকনাফে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোর উপর দিয়ে অতিক্রম করতে পারে। ফলে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে ব্যাপক বৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড় ধসের প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। স্থল ভাগে আঘাতের সময় ঘূর্ণিঝড় মোখার বাতাসের গতিবেগ থাকতে পারে ঘণ্টায় ১৩০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার। এই গতিবেগে মোখা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার উপকূলের উপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় এই দুই জেলার উপকূলীয় এলাকাগুলো ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হওয়ার আশংকা রয়েছে।

এদিকে গতকাল সচিবালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটির সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের গতি প্রকৃতি ও অবস্থান নিয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যালোচনা তথ্য তুলে ধরে সাংবাদিকদের বলেন, ১৩ মে সন্ধ্যা থেকে ১৪ মে সকালের মধ্যে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে আঘাত হানতে পারে বলে পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। ১২ মে নাগাদ এটি উত্তর পূর্ব দিকে বাঁক নেবে এবং কক্সবাজার জেলা ও মিয়ানমার উপকূল দিয়ে আঘাত হানবে। আঘাতের সময় বাতাসের বেগ ১৮০ থেকে ২২০ কিলোমিটার থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতীয় আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ পরিণত হবে। ক্রমশ উত্তর এবং উত্তর–পশ্চিম দিকে অগ্রসর হবে। তার পর বাঁক নিয়ে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ উপকূলের দিকে যাবে এই ঘূর্ণিঝড়টি।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস যা বলল : গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, দক্ষিণ–পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি আরো উত্তর–উত্তরপশ্চিম দিক অগ্রসর হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করবে। এটি আরো ঘনীভূত হয়ে উত্তর–উত্তরপশ্চিম দিকে ও পরবর্তীতে দিক পরিবর্তন করে ক্রমান্বয়ে উত্তর–উত্তরপূর্বে অগ্রসর হতে পারে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা উজ্জ্বল কান্তি পাল বলেন, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের জন্য ১ নম্বর দূরবর্তী সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। আজ আকাশ অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলাসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn