এপ্রিল ১৭, ২০২৪ ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

চসিকেব ১৮৮৭ কোটি টাকার বাজেট

চট্টলার কণ্ঠ।

নগর উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রেখে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) আগামী ২০২৩–২০২৪ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৮৮৭ কোটি ২৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এতে নগর উন্নয়নে ৯৪২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এবারের বাজেট নিজস্ব উৎস থেকে সর্বোচ্চ ৯৫০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা আয় ধরা হয়েছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে আন্দরকিল্লাস্থ নগর ভবনের কে বি আবদুচ সাত্তার মিলনায়তনে প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেন সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। এসময় ২০২২–২০২৩ অর্থবছরের সংশোধিত ১ হাজার ১৭৬ কোটি ২৮ লাখ ১০ হাজার টাকার বাজেটও ঘোষণা করেন মেয়র। অর্থবছরটির প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ২ হাজার ১৬১ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিদায় অর্থ বছরের বাজেট বাস্তবায়নের হার ৫৪ দশমিক ৪২ শতাংশ।

এবারে প্রস্তাবিত বাজেট বিদায়ী অর্থ বছরের চেয়ে ২৭৩ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা কম। বাজেটের আকার কমলেও নাগরিক সেবা কমবে না বলে জানিয়েছেন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, কোভিড পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রধানমন্ত্রী ব্যয় সংকোচন নীতি অবলম্বন করার জন্য বলেছেন। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় কমিয়েছি। তাই গতবার আমাদের বাজেট বাস্তবায়নের হার ৫৫ শতাংশ। এবারও বাজেট কমানো হয়েছে। তবে সেবার ক্ষেত্রে কোনো কমতি হবে না। নাগরিক সেবা যতটুকু দেয়া দরকার ততটুকু দিব। যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রতিবছর ভর্তুকি দিচ্ছি, তাই বলে কি ওসব সেবা বন্ধ করে দিয়েছি? দিইনি। তিনি প্রস্তাবিত বাজেটের মধ্য দিয়ে নগরবাসীর আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর প্রত্যাশা ও নগরকে পরিবেশগত, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাসযোগ্য নান্দনিক নগর প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন।

বাজেট বক্তৃতায় মেয়র নগর উন্নয়নে চসিকের চলমান আড়াই হাজার কোটি টাকার বিমানবন্দর সড়ক সম্প্রসারণসহ সড়ক অবকাঠামোগত প্রকল্প, ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার বাড়ইপাড়া খাল খনন প্রকল্প, ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার বাস–ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি এবং পাইপলাইনে রয়েছে এমন প্রকল্পের তথ্য তুলে ধরেন। আডাই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বিষয়ে বলেন, প্রকল্পটির আওতায় ৭৪টি উপ–প্রকল্পে প্রায় ৪৩০ কোটি টাকার অধিক দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। ইতোমধ্যে ৩৯টি দরপত্রের মূল্যায়ন চলমান।

এসময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। পরিচ্ছন্নতার জন্য একসময় চট্টগ্রাম সিটিকে ‘আদর্শ’ বলা হলেও বর্তমানে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে রাজশাহীর নাম আসে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়র বলেন, রাজশাহীতে সিটি কর্পোরেশনে ভোটার ৫ লাখ। চট্টগ্রামে ৭০ লাখ মানুষ বাস করে। চট্টগ্রাম শহরের পরিধি কিন্তু ৬০ বর্গমাইল থেকে বাড়েনি। এখানে অতিরিক্ত জনসংখ্যা, তার উপর দিন দিন এখানে বাইরের লোকের চাপ বাড়ছে। স্টেশনে রোডে গেলে দেখবেন তাল, আম, কাঠালসহ মৌসুমী ফলের নানা আবর্জনা পরিষ্কার করার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার হয়ে যাচ্ছে। একদিকে পরিষ্কার করি অন্যদিকে তারা ফেলছে।

মশক নিধন কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, মশক নিধনের জন্য আলাদা কোনো বিভাগ আগে ছিল না। আমরাই প্রথম করেছি। মশক নিধন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছি। মশামুক্ত নগরী করতে চেষ্টা করছি। এ খাতে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি।

জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত উদ্যোগ সম্পর্কে মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ করছে সিডিএ, সেই কাজ শেষ হলে এবং বাড়ইপাড়া খালের কাজ শেষ হলে অনেকটা মুক্তি পাব। জলাবদ্ধতা প্রকল্পের বাইরে নতুন করে ২২টি খাল মুক্ত করতে প্রস্তাব আমরা পাঠিয়েছি। সেগুলোর অনুমোদন পেলে দখলমুক্ত ও সংস্কারের কাজ শুরু করতে পারব।

এসময় বাড়ইপাড়া খাল প্রকল্প সম্পর্কে বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের পাঁচটি এলএ মামলার মধ্যে তিনটির অধিগ্রহণকৃত ভূমি আমাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়। প্রকল্পের সাড়ে চার হাজার ফুট প্রতিরোধ দেয়াল ও আড়াই হাজার ফুট ড্রেন নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। রাস্তা নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কর্ণফুলী নদীর সংযোগ স্থলে সিডিএ কর্তৃক স্লুইচ গেট নির্মাণকাজ শেষ হলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এলাকা পূর্ব বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া ও পশ্চিম বাকলিয়াসহ অন্যান্য এলাকা জলজট তথা জলাবদ্ধতা হতে মুক্ত হবে।

চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে বাজেট অধিবেশনে বাজেট বিবরণী উপস্থাপন করেন অর্থ ও সংস্থাপন বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর মো. ইসমাইল। উপস্থিত ছিলেন চসিক সচিব খালেদ মাহমুদ, অতিরিক্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলরবৃন্দ।

আয় খাত : প্রস্তাবিত বাজেটে নিজস্ব উৎস থেকে ৯৫০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে হাল ও বকেয়া পৌরকরসহ তিন ধরনের কর থেকে ৬৪০ কোটি ৫ লাখ টাকা আয় ধরা হয়। পৌরকরের মধ্যে হাল গৃহকর, আলোকায়ন ও পরিচ্ছন্ন রেইট খাতে ২২২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, বকেয়া গৃহকর, আলোকায়ন ও পরিচ্ছন্ন রেইট খাতে ২২৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং অন্যান্য কর বাবদ ১৯৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা আয় ধরা হয়েছে। ২০২২–২০২৩ অর্থ বছরে এ এই তিন খাতে আয় হয়েছে ৩৩১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এছাড়া প্রকল্পের বিপরীতে উন্নয়ন অনুদান হিসেবে আয় ধরা হয় ৮৯৪ কোটি টাকা। গত অর্থ বছরে এ খাতে আয় হয়েছে ৬৪১ কোটি সাড়ে ২৭ লাখ টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে রাস্তা খননসহ বিভিন্ন ফিস থেকে ১৩৩ কোটি ২২ লাখ টাকা, জরিমানা খাতে ১ কোটি টাকা, ব্যাংক স্থিতি থেকে ১ কোটি টাকা এবং সম্পদ থেকে অর্জিত ভাড়াসহ আয় ধরা হয় ১০১ কোটি ২৫ লাখ টাকা আয় ধরা হয়। অন্যান্য উৎস থেকেও ৩৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর কর, স্বাস্থ্য রেজিস্ট্রেশন ও জন্ম–মৃত্যু, পেশা ও ব্যবসা–বাণিজ্য, বিজ্ঞাপন–সাইনবোর্ড, যানবাহন কর, সিনেমা ও প্রমোদকর খাতে ১৯৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা আয় ধরা হয়েছে।

ব্যয় খাত সমূহ : প্রস্তাবিত বাজেটে নগর উন্নয়নে প্রকল্পের বিপরীতে ৭৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। গত অর্থ বছরে উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে ব্যয় হয় ৬০৯ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া রাস্তা ও ফুটপাতের উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, সড়ক বাতির উন্নয়নসহ ২২টি খাতে রাজস্ব তহবিলের বিপরীতে উন্নয়ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয় ১৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গতবার রাজস্ব তহবিলের বিপরীতে ব্যয় হয় ৩৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

গতবার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৩৯৫ কোটি ৯৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হলেও এবার প্রস্তাবিত বাজেটে ৫৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে। এর মধ্যে বেতনভাতা ও পারিশ্রমিক পরিশোধে ৩১০ কোটি ৭০ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি খাতে ৫৪ কোটি টাকা ৫০ লাখ টাকা, কল্যাণমূলক ব্যয় ৩৭ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং আতিথেয়তা ও উৎসব খাতে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

এবার বাজেটে চসিকের বকেয়া দেনা পরিশোধে ১২৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে বকেয়া পরিশোধ করা হবে ৪০ কোটি টাকা। পূর্বের ন্যায় এবারো মশক নিধন খাতে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর মধ্যে ওষুধ ক্রয়ে তিন কোটি টাকা এবং ফগার ও হ্যান্ড স্প্রে মেশিন কেনায় দুই কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। গত অর্থবছরে মশক নিধন খাতে ব্যয় হয় মাত্র ৯০ লাখ টাকা। এছাড়া বিটুমিন, পাথর, ইট, বালি, রড, সিমেন্ট, সেনিটারি মালামাল ক্রয়ে ৫ কোটি বরাদ্দ রাখা হয়। গতবার এ খাতে ২ কোটি ব্যয় হয়।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn