ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৪ ২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসে আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা

ইমরান নাজির।

বৈশ্বিক সংকটে স্বাভাবিক আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে না ।। দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের আশংকা

ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধসহ বৈশ্বিক সংকটে আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাবে চট্টগ্রাম বন্দর এবং কাস্টমসের আয় কমে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। পণ্য পরিবহন কমে যাওয়ায় জাহাজের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। এতে করে জাহাজ হ্যান্ডলিংসহ নানা খাত থেকে বন্দরের আয় প্রত্যাশার চেয়ে কম হচ্ছে। রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার ঘটনা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের আশংকা তৈরি করছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০২২ সালের জুলাই মাসে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৯৩৪ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল। চলতি বছরের জুলাই মাসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ১৬১ টিইইউএস। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ২০২২ সালের জুলাই মাসের তুলনায় আমদানি পণ্যবাহী কন্টেনার হ্যান্ডলিং কম হয়েছে ২১২ টিইইউএস। রপ্তানি পণ্যবাহী কন্টেনার হ্যান্ডলিং কম হয়েছে ১০ হাজার ৫৩২ টিইইউএস। অপরদিকে চলতি বছরের জুলাই মাসে জুন মাসের তুলনায় পণ্যবাহী আমদানি কন্টেনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৯,৬৩০ টিইইউএস। তবে আমদানি কন্টেনার হ্যান্ডলিং বাড়লেও এক মাসের ব্যবধানে ১৫,৭৯৯ টিইইউ রপ্তানি কন্টেনার হ্যান্ডলিং কমে গেছে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে এলসি খোলার ব্যাপারে নমনীয় হওয়ায় পণ্য আমদানি বেড়েছে। তবে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক সংকটে বিদেশী ক্রেতারা আগের থেকে অনেক কম পোশাক ব্যবহার করছে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজার কমে যাওয়ায় কমে গেছে রপ্তানি।

স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের সংখ্যাও কমে গেছে। এতে করে বন্দরে একাধিক জেটি দিনের পর দিন খালি থাকছে। এক একটি জাহাজ হ্যান্ডলিং থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ গড়ে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে। জাহাজের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বন্দরের এই আয় কমে যাচ্ছে।

অপরদিকে আমদানি বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই জুড়ে বিরাজ করছে ভোগ্যপণ্যসহ অতি প্রয়োজনীয় পণ্য। গাড়িসহ শুল্ক বেশি হয় এমন বিলাস সামগ্রী আমদানি একেবারে কমে গেছে। এতে করে চট্টগ্রাম কাস্টমসের আয় বেশ কমতে শুরু করেছে। দেশের মোট শুল্ক–কর আদায়ের এক পঞ্চমাংশ আদায় হয় চট্টগ্রাম কাস্টমসের মাধ্যমে। কিন্তু প্রায় প্রতিবছরই ঘাটতির মুখে থাকা এবার চট্টগ্রাম কাস্টমসের আয় আরো কমে যাবে বলে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে কাস্টমসকে ৭৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কাস্টমস আয় করে ৬১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। গত বছর চট্টগ্রাম কাস্টমস রেকর্ড পরিমান রাজস্ব আয় করলেও ঘাটতি ছিল ১২ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম দুই মাস গত হতে চললেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। চলতি অর্থবছরে কাস্টমসের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৭ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা।

কাস্টমসের দায়িত্বশীল একটি সূত্র চট্টলার  কন্ঠকে  জানায়, ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধসহ বিশ্বব্যাপী যে সংকট তাতে স্বাভাবিক আমদানি রপ্তানি হচ্ছে না। ডলার সংকট বহু দেশেরই অর্থনীতিকে বড় ধরণের ধাক্কা দিয়েছে। বাংলাদেশেও সংকট প্রকট। এর ফলে মূলধনি যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন ধরণের বিলাস পণ্য আমদানি এবং ভোগ্যপণ্য আমদানি কমে গেছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আয়ে। চট্টগ্রাম বন্দর এবং কাস্টমসের আয় রোজগার কমে যাওয়ার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।

সাইফ মেরিটাইম লিমিটেডের সিও আব্দুল্লাহ জহির গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আমদানি আগের তুলনায় বাড়ছে। বন্দরে জাহাজের সংখ্যা আগের তুলনায় কম আসলেও পরিস্থিতির উন্নতি হলে জাহাজের সংখ্যা বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ডলার সংকট আগের মতো প্রকট নেই। তাই এলসি খোলার কড়াকড়িও অনেকটা শিথিল করা হচ্ছে। রপ্তানিতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দার ধাক্কায় বিদেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ব্যবহার কমেছে। যার প্রভাব রপ্তানি বাণিজ্যে দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠলে এই অবস্থার উন্নতি ঘটবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক চট্রলার কন্ঠকে  বলেন, বন্দরে জাহাজের সংখ্যা কিছুটা কমছে। তবে এখনি বিষয়টি নিয়ে হতাশ হওয়ার মতো কোন পরিস্থিতি হয়নি। বছর শেষ না হলে জাহাজের সংখ্যা হিসেব করে লাভ নেই। কোন মাসে জাহাজ বাড়বে, আয় বাড়বে। আবার কোন মাসে কমবে। এগুলো স্বাভাবিক। তিনি বলেন, আগের তুলনায় জাহাজের আকৃতি বড় হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে বড় জাহাজ আসছে। আমরা বড় জাহাজকে উৎসাহিত করছি। তাই জাহাজের সংখ্যা কমলেও পণ্যের পরিমান বাড়ছে। যা ইতিবাচক বলেও বন্দর সচিব মন্তব্য করেন।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn