জুলাই ১৯, ২০২৪ ৩:০৬ পূর্বাহ্ণ

টানা চতুর্থ হার সাকিবদের

বাংলাদেশ দলে আসতে তাকে কম লড়াই করতে হয়নি। জাতীয় দলের দরজা এক রকম বন্ধই হয়ে গিয়েছিল তার জন্য। কিন্তু দলে ফিরে তিনি বুঝিয়ে দিলেন দেশের ক্রিকেটকে তার দেওয়ার মতো এখনো অনেক কিছু রয়েছে। যে মাহমুদউল্লাহকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিল নির্বাচকরা সেই মাহমুদউল্লাহই বাংলাদেশ দলের মান রক্ষা করে যাচ্ছেন এবারের বিশ্বকাপে। এবারের বিশ্বকাপে চার ম্যাচ খেলেছেন মাহমুদউল্লাহ। যার মধ্যে প্রথম ম্যাচে ব্যাট করতে পারেননি। দ্বিতীয় ম্যাচে দলে ছিলেন না। পরের তিন ম্যাচের দুটিতে হাফ সেঞ্চুরির কাছে গিয়ে ফিরলেও গতকাল তুলে নিয়েছেন সেঞ্চৃরি। আর তারই সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশ দল চরম লজ্জার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। যে দল শতরানের নিচে অল আউট হওয়ার শংকাতে ছিল সে দলকে দুইশ পার করে দিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। তার সেঞ্চুরি সত্ত্বেও বাংলাদেশ দল হেরেছে ১৪৯ রানের বিশাল ব্যবধানে। এবারের বিশ্বকাপে প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেওয়া মাহমুদউল্লাহর বিশ্বকাপে এটি তৃতীয় সেঞ্চুরি। আগের দুটি সেঞ্চুরি ছিল ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এবার করলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অবস্থা হয়ে গেছে জোড়া তালি দিয়ে চলার মতো।

যেখনে কখনো বোলিং ভালো হলে ব্যাটিং নাই। আবার দেখা যায় ফিল্ডিং নেই। আবার দেখা যায় ব্যাটিং, বোলিং কোনটাই নাই। আবার ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং কোনটিই নেই। গতকাল তেমনটিই হয়েছে। ক্রিকেটের তিন বিভাগেই হাবুডুবু খেয়েছে বাংলাদেশ। একমাত্র মাহমুদউল্লাহই ছিলেন ব্যতিক্রম। এবারের বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা যেখানে রানের ফোয়ারা ছুটাচ্ছে সেখানে রানের জন্য মাথা কুড়ে মরছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই করেছে তিনশর বেশি রান। যেখানে ৪২৮ তাদের সর্বোচ্চ। বাকি ইনিংস গুলো ৩১১, ৩৯৯ এবং ৩৮২। অপরদিকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংস ২৫৬। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ব্যাটিংটা হাঁটছে পেছনের দিকে। ফলে আরেকটি জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। বলা যায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়ের যে স্বপ্ন দেখেছিল বাংলাদেশ সে স্বপ্নের বেলুন ফুটো হয়ে গেল দলের চরম ব্যর্থতায়। সেই দ্বিতীয় ম্যাচ থেকেই শুরু হওয়া ব্যাটিং ব্যর্থতা অব্যাহত রেখেছে ক্রিকেটাররা একেবারে সগৌরবে। আর গতকালের ম্যাচে ব্যাটিং ব্যর্থতার সাথে যোগ হয়েছে চরম বোলিং বিপর্যয়। আর তাতেই বরণ করতে হলো আরো একটি লজ্জার হার। মুম্বাইতে এবারের হারটা আরো বড় ১৪৯ রানের। আর এটি এবারের টুর্নামেন্টে টানা চতুর্থ হার বাংলাদেশের। আর দক্ষিণ আফ্রিকার চতুর্থ জয়। আগের দিন ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসে সাকিব বলেছিলেন এখনো ভালো করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পরদিন মাঠে তার সে কথার কবর রচনা করে এলেন সাকিব নিজেই। এরপর তাকে অনুসরণ করেছে অন্য ব্যাটাররাও। যার পরিণতি আরো একটি লজ্জার পরাজয়।

টসে জিতে ব্যাট করতে নামা দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছিলেন শরীফুল ইসলাম। ১২ রান করা রেজা হেনরিককে যখন বোল্ড করে ফেরান শরীফুল তখন দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ৩৩ রান। সে ধাক্কা সামলে না উঠতেই এবার মিরাজের আঘাত। ১ রান করা দুশানকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে ফেরান মিরাজ। ৩৬ রানে নেই প্রোটিয়াদের দুই উইকেট। তবে এরপর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন কুইন্টন ডি কক এবং অধিনায়ক এডিন মার্করাম। দুজন মিলে যোগ করেন ১৩১ রান। সাকিব এসে এ জুটি ভেঙেছেন বটে। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ৬৯ বলে ৬০ রান করা মার্করামকে ফেরান সাকিব। এরপর ডি ককের সাথে জুটি বাঁধেন আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান হেনরিক ক্লাসেন। এ দুজন রানের চাকাকে আরো দ্রুত ঘুরাচ্ছিলেন। বিশেষ করে কুইন্টন ডি কক ছিলেন দুর্দান্ত মারমুখি।

একশ, দেড়শ পেরিয়ে এই প্রোটিয়া ওপেনার ছুটছিলেন ডুবল সেঞ্চুরির দিকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেননি হাসান মাহমুদ। এই পেসারের বলে একেবারে সীমানায় দারুণ এক ক্যাচ নেন নাসুম আহমেদ। তবে ফেরার আগে ১৪০ বলে ১৭৪ রান করে দলকে রানের পাহাড়ে পৌঁছে দিয়ে আসেন ডি কক। এরপরও রানের চাকা থামেনি দক্ষিন আফ্রিকার। ডি ককের পর ক্লাসেনের ব্যাট যেন কচু কাটা করছিল বাংলাদেশের বোলারদের। যদিও শেষ ওভারে তাকে সেঞ্চুরি বঞ্চিত করতে পারেন হাসান মাহমুদ। আগের ম্যাচে এই মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৭ বলে ১০৯ রান করা ক্লাসেন এবার ফিরেছেন ৪৯ বলে ৯০ রান করে। যেখানে তিনি ২টি চারের পাশাপাশি ছক্কা মেরেছেন ৮টি। ডেভিড মিলারের ১৫ বলে ৩৪ রানের সুবাধে ৩৮২ রানের পাহাড়ে চড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। শেষ দশ ওভারে ১৪৪ রান যোগ করে প্রোটিয়াস ব্যাটাররা। বাংলাদেশের বোলারদের দুর্দিনে ৬৭ রানে ২ উইকেট নিয়েছেন হাসান মাহমুদ।

৩৮৩ রানের হিমালয় টপকাতে গিয়ে শুরুতেই হোঁচট খায় বাংলাদেশ। দলের খাতায় ৩০ রান যোগ হতেই ফিরেন তানজিদ হাসান তামিম। এই ওপেনার করেন ১২ রান। ওয়ান ডাউনে নামা নাজমুল হোসেন শান্ত খেলেছেন এক বল। জেনসেনের বলে ক্লাসেনের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন শান্ত। দলের ভরসা তখন সাকিব। কিন্তু তিনি যেভাবে খেললেন সেটা মোটেও অধিনায়কের দায়িত্ব হতে পারে না। যেভাবে খোঁচা দিয়ে ফিরলেন সাকিব তাতে তার দায়িত্বহীনতারই পরিচয় মেলে। যদিও ক্লাসেন দুর্দান্তভাবে ক্যাচটি নিয়েছেন। ৩১ রানে নেই ৩ উইকেট। লক্ষ্যটা তখন আরো বড় পাহাড় হয়ে গেছে। মুশফিকের সাথে জুটি বেঁধে দলকে টানবেন মাহমুদউল্লাহ তেমন প্রত্যাশা যখন করছিল সবাই তখনই সে প্রত্যাশায় জল ঢেলে দিলেন মুশফিক। ফিরলেন ৮ রান করে। ইনিংসের শুরু থেকেই রানের লড়াই করতে থাকা লিটন দাশও আর উইকেটে থাকতে পারলেন না। ড্রেসিং রুমে ফিরে গেলেই যেন বাঁচে। তাই তিনিও ধরলেন অন্যদের পথ।

১৫ ওভার পর্যন্ত উইকেটে থেকে ৪৪ বলে ২২ রান করে দায়িত্ব শেষ করলেন লিটন। ৫৮ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন লজ্জার একেবারে দোড় গোড়ায়। ১৯ বল খেলা মেহেদী হাসান মিরাজেরও যেন মনে হলো অনেক্ষণতো হলো। আর কতক্ষণ ব্যাট করব। তাই তিনিও ফিরলেন অযথা ছক্কা মারতে গিয়ে ১১ রান করে। নাসুম এসেও বেশিক্ষণ সঙ্গ দিতে পারলেন না মাহমুদউল্লাহকে। ফিরেছেন ১৯ বলে ১৯ রান করে। তবে লজ্জা নিবারণের লড়াইটা চালিয়ে গেছেন একজন মাহমুদউল্লাহই। হাসান মাহমুদ ফিরেছেন ১৫ রান করে। দলকে টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়া মাহমুদউল্লাহ ব্যক্তিগত ৭৩ রানে ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান। তবে জীবন পাওয়াটাকে বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। তুলে নিয়েছেন দারুণ এক সেঞ্চুরি। যে সেঞ্চুরি দিয়ে দলকে লজ্জার হাত থেকেই শুধু বাঁচাননি। দিয়েছেন হাজারো প্রশ্ন এবং অবজ্ঞার জবাবও। দলকে ২২৭ রানে পৌঁছে দিয়ে ১১১ বলে ১১টি চার এবং ৪টি ছক্কার সাহায্যে ১১১ রান করে ফিরেন মাহমুদউল্লাহ। তিনি আউট হওয়ার পর আর বেশি দূর এগুতে পারেনি বাংলাদেশ। থামে ২৩৩ রানে। টানা চার ম্যাচে হেরে বাংলাদেশ দল এবার খেলতে যাবে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে। যেখানে দুটি ম্যাচ রয়েছে টাইগারদের। ২৮ অক্টোবর নেদারল্যান্ডস এবং ৩১ অক্টোবর পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলবে বাংলাদেশ।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn