ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৪ ৩:৫৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামে গ্যাস সংকটে বাড়ছে এলপিজি নির্ভরতা

ওয়াসিম জাফর।

লাগাতার গ্যাস সংকটে এলপিজি নির্ভরতা বাড়ছে। গ্যাস সংযোগ রয়েছে এমন বাসাবাড়িতেও নেয়া হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার। নগরীর পাশাপাশি গ্রামেগঞ্জেও এলপিজির ব্যবহার প্রতিদিনই বাড়ছে। আর এই বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ চক্র সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ওজনে কম দেয়াসহ নানা গোঁজামিল দিয়ে ঠকানো হচ্ছে ক্রেতাদের। সরকারি এলপিজি নিয়ে একটি চক্র বছরের পর বছর ধরে হরিলুট চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র এই খবর জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, দেশে এলপিজির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। মাত্র বছর কয়েকের মধ্যে এলপিজির চাহিদা ১২ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। গত ১০ বছর ধরে প্রতিবছর গড়ে ৩৫ শতাংশ হারে এলপিজি ব্যবহার বাড়ছে। লাইনের গ্যাসে হাহাকার এই চাহিদাকে উস্কে দিচ্ছে। চট্টগ্রামে আবাসন খাতে ছয় লাখের মতো সংযোগ রয়েছে। অথচ নগরীতে বারো লাখেরও বেশি পরিবার বসবাস করে। বাকি পরিবারগুলো এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করে। আবার কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সংযোগ রয়েছে এমন বাসাবাড়িগুলোতেও এলপিজি ব্যবহার বাড়ছে। গ্যাস সরবরাহে যখন তখন সংকট দেখা দেয়ার কারণে লাইনের গ্যাসের পাশাপাশি এলপিজি সিলিন্ডার রাখছে বহু পরিবারই। এদিকে গ্রামেগঞ্জে এখন আর খড় পাতা কুড়িয়ে রান্নাবান্নার দিন শেষ হয়ে গেছে। ঘরে ঘরে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করে রান্নাবান্নার কার্যক্রম চলে। অপরদিকে যানবাহনেও এলপিজি ব্যবহার বাড়ছে। পেট্রোল অকটেনের অত্যধিক মূল্যের বিপরীতে যানবাহনের মালিকেরা সিএনজির দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু সিএনজি নিয়ে সংকট তৈরি হওয়ায় অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমানে দেশে রান্নার জ্বালানির প্রায় সমপরিমান এলপিজি যানবাহনে ব্যবহৃত হচ্ছে। এলপিজির ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে আমদানিকৃত এই জ্বালানি নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার নানা মিশন বাস্তবায়িত করছে। দেশে বর্তমানে ১২ লাখ টনেরও বেশি এলপিজি ব্যবহৃত হয়।

দেশের এলপিজি সেক্টরের প্রায় পুরোটাই আমদানি নির্ভর। আর এই আমদানির প্রায় শতভাগই করা হয় বেসরকারিখাতে। দেশে ব্যবহৃত ১২ লাখ এলপিজির মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টন ইস্টার্ন রিফাইনারীতে পাওয়া যায়। বাকি এলপিজির পুরোটাই আমদানি করা হয় বেসরকারিখাতে।

বর্তমানে দেশে বেসরকারি পর্যায়ে ১২ কেজির এলপি গ্যাসের নির্ধারিত দাম ১৩৬৩ টাকা। অপরদিকে সরকারি খাতের বিপিসির মালিকানাধীন এলপি গ্যাস লিমিটেডের (এলপিজিএল) সাড়ে ১২ কেজি গ্যাসের দাম মাত্র ৫৯১ টাকা। সরকারি এলপিজির দাম বেসরকারি এলপিজির অর্ধেকেরও কম হওয়ায় এই গ্যাস অনেকটা সোনার হরিণ। ৫৯১ টাকায় কোথাও এই এলপিজি পাওয়া যায় না। দ্বিগুণেরও বেশি দাম দিয়েও এই এলপিজি পাওয়া অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সংঘবদ্ধ একটি চক্র সরকারি এলপিজি নানাভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ৩৭১জন ডিলারের মাধ্যমে এলপিজি সরবরাহ দেয়ার কথা থাকলেও মূলতঃ ১০/১২ জন ডিলারের একটি সিন্ডিকেট সরকারি এলপিজির পুরো বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করে। তারা তাদের মর্জি মাফিক দর হাতিয়ে নিয়ে এই এলপিজি সরবরাহ দেয়। শুধু দামে নয়, সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বের করে নেয়ার ঘটনাও প্রাত্যহিক বলে সূত্র জানিয়েছে।

দেশের এলপিজি সেক্টরের ৯৮ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি আমদানিখাত। হাতেগোনা কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) এর দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলেছে, দেশে মোট ৫৬টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নিয়েছে। ২৮টি কোম্পানি বর্তমানে বাজারে সক্রিয়। এর মধ্যে ২০টি কোম্পানি সরাসরি আমদানি করে। বেসরকারিখাতের এলপিজি সিলিন্ডারেও মাপে কম দেয়া, বিভিন্নভাবে বাড়তি দাম হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটে। গ্যাস সিলিন্ডার কেটে ফেলার মাধ্যমে সংকট তৈরি করাসহ নানাভাবে এলপিজি গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে উঠছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, এলপিজি নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় গত বেশ কয়েকবছর ধরে। দিনে দিনে এই চক্র বিপিসির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

এ বিষয়ে বিপিসির পদস্থ একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি চট্টলার কণ্ঠকে বলেন, বিপিসি এলপিজি আমদানি করে না। ইস্টার্ন রিফাইনারীর বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে পায়। এই গ্যাস এলপিজি প্ল্যান্টে বোতলজাত করে বিপিসি সংশ্লিষ্ট বিপণন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাজারজাত করে। ডিলারশিপের মাধ্যমে বিপিসির এই কার্যক্রম চলে। তবে ডিলারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়মের অভিযোগ উটে। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়। তবে ১০/১২ হাজার টন এলপিজি তাদের মাধ্যমেই বাজারজাত করা হয়। দেশে দিনে দিনে এলপিজি ব্যবহার যে পর্যায়ে গিয়ে ঠেকছে ভবিষ্যতে বিপিসিকে এলপিজি আমদানি করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বেসরকারি খাতের উপর বিপিসির কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বেসরকারিখাতের বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আমদানিকারকদের যা ইচ্ছে তা করার সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


 

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn