ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৪ ১:২৩ অপরাহ্ণ

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আবার পরিবর্তন

ইমরান নাজির।

চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন নগর করতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। এর অংশ হিসেবে দিনের পরিবর্তে রাতের বেলা ময়লা–আবর্জনা অপসারণ করবে সংস্থাটির পরিচ্ছন্ন বিভাগ। একইসঙ্গে সড়ক পরিষ্কারও করা হবে রাতে। গত রাত থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিনের বেলা মানুষের চলাচল বেশি থাকে। এ সময় যেখানে–সেখানে ময়লা পড়ে থাকায় দুর্গন্ধে পথচারীদের চলাচল করতে সমস্যা হয়। নতুন নিয়মের ফলে এ সমস্যা থেকে রক্ষা পাবেন নগরবাসী। একইসঙ্গে ময়লাবাহী গাড়ির জন্য সৃষ্ট যানজট থেকে রক্ষা মিলবে।

জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সিএমপি থেকে চসিককে দেওয়া একটি চিঠিতে রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শেষ করার অনুরোধ করা হয়। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের ভাসমান ডাস্টবিন, স্তূপাকারে থাকা ময়লা ও আবর্জনা ভর্তি কন্টেনারের কারণে যান চলাচলে ব্যাঘাতসহ ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামের সৃষ্টি হয় বলে উল্লেখ করা হয়। এদিকে চসিকের নতুন সূচি অনুযায়ী বাসাবাড়ি থেকে চসিকের ডোর টু ডোর প্রকল্পের শ্রমিকরা দুপুর ২টার পর বর্জ্য সংগ্রহ শুরু করবে। সংগৃহীত ময়লা বিদ্যমান ৭টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) এবং দেড় শতাধিক উন্মুক্ত পয়েন্টে নিয়ে আসা হবে। রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ময়লাগুলো ডাম্প ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হবে আরেফিন নগর ও হালিশহর আনন্দবাজারে অবস্থিত চসিকের দুটো ল্যান্ডফিলে। এতদিন দিনের বেলা নগরের বিভিন্ন সড়কে ঝাড়ু দেওয়াসহ ময়লা অপসারণ করতেন চসিকের পরিচ্ছন্নকর্মীরা। এখন থেকে তা রাতেই করা হবে। এছাড়া বিভিন্ন খাল থেকে চসিকের নিজস্ব জনবল দিয়ে সকাল ৭টা থেকে ২টার মধ্যে মাটি বা আবর্জনা অপসারণ করা হবে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কমান্ডার লতিফুল হক কাজমী গত রাতে আজাদীকে বলেন, আজ (গতকাল) থেকে নতুন সূচি অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এখন থেকে দিনের বেলা কোনো সুইপিং থাকবে না। রাতেই হবে। পৃথিবীর সমস্ত সভ্য দেশে রাস্তায় ময়লা দেখা যায় না। দিনের বেলা মানুষের চলাচল থাকে। এ সময় অফিস–আদালত বা কাজে যায়। তখন যদি শহরটা পরিচ্ছন্ন থাকে তার মনটাও তো ভালো হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, বাসা–বাড়ি থেকে ডোর টু ডোর কালেকশন চলবে। ডোর টু ডোর শ্রমিকরা ২টা থেকে শুরু করবে। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ তারা এসটিএসে নিয়ে আসবে। রাতেই আমরা ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাব। বর্তমানে নগর থেকে প্রতিদিন ১৯শ থেকে ২১শ টন ময়লা অপসারণ করা হয় বলে জানান তিনি।

এক কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্রলার কণ্ঠকে  বলেন, দিনের পরিবর্তে রাতে ময়লা অপসারণের বিষয়টি আমাদের আগেভাগে অবহিত করেনি। আজ (গতকাল) দিনের ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্ন শ্রমিকরা না আসায় জানতে পেরেছি। এত বড় একটা উদ্যোগ সেটা নিয়ে আরো জোরালো প্রচারণা চালানো উচিত ছিল। নগরবাসীরও তো বিষয়টি জানা থাকতে হবে।

চসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের উদ্যোগে দিনের পরিবর্তে রাতের বেলা ময়লা অপসারণ শুরু হয়। তখন নগরবাসীকে কর্পোরেশনের নির্ধারিত স্থানে সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত এগারোটার মধ্যে ময়লা–আবর্জনাগুলো ফেলতে হতো। চসিক রাত দশটা থেকে ভোর ছয়টার মধ্যে অপসারণ করত।

২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পরবর্তীতে ৩ ধাপে কার্যকর করা হয়েছে ডোর টু ডোর ময়লা অপসারণ কার্যক্রম। ওই কার্যক্রমের আওতায় বিকাল ৩টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত প্রতিটি বাসা–বাড়ি থেকে সরাসরি ময়লা সংগ্রহ শুরু করেন চসিকের পরিচ্ছন্নকর্মীরা। আর তা রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট আর্বজনাগারে ফেলা হচ্ছে। এর কিছুদিন পর রাতের বেলা ময়লা অপসারণ কার্যক্রম থমকে যায়।

জানা গেছে, প্রয়াত সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর আমলেও রাতের বেলা ময়লা–আর্বজনা অপসারণ করত চসিক। তবে আলোচিত ওয়ান–ইলেভেনের সময় দুপুর ২টা থেকে ময়লা–আর্বজনা অপসারণ শুরু হয়। পরবর্তীতে শুধুমাত্র ১০টি ওয়ার্ড থেকে পুনরায় রাতের বেলা অপসারণ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে তা বন্ধ হয়ে যায় মেয়র মনজুর আলমের আমলে।

২০১৯–২০২০ অর্থবছরে জাইকা নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি গবেষণা করে। ওই গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের ৪১ ওয়ার্ডে দৈনিক ৩ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৩০ টন গৃহস্থালি, ৫১০ টন সড়ক ও অবকাঠামোগত এবং ৬৬০ টন মেডিকেল বর্জ্য। উৎপাদিত বর্জ্যের মধ্যে কর্পোরেশন সংগ্রহ করে দুই হাজার টন। বাকি বর্জ্য নালা–নর্দমা, খাল–বিল, নদী ও উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন অ্যাক্ট ২০০৯–এর তৃতীয় তফসিলের ১.৪ থেকে ১.৭ পর্যন্ত অনুচ্ছেদে আবর্জনা অপসারণ, সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া আছে। এতে উল্লেখ আছে, ‘কর্পোরেশন তার নিয়ন্ত্রণাধীন সকল জনপথ, সাধারণ পায়খানা, প্রস্রাবখানা, নর্দমা, ইমারত ও জায়গা থেকে আবর্জনা সংগ্রহ ও অপসারণ করার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কর্পোরেশন নগরবাসীর জন্য নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার ব্যবস্থা করবেন এবং সাধারণ নোটিশের মাধ্যমে ওখানে ময়লা ফেলার জন্য নির্দেশ দিতে পারবেন।’ এই অ্যাক্ট মতে, চসিকের নতুন সিদ্ধান্তের বিষয়ে কারো আপত্তি থাকার সুযোগ নেই।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn