ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৪ ৩:০৮ পূর্বাহ্ণ

ইউপিডিএফের চার নেতাকে গুলি করে হত্যা

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) চার নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গত সোমবার রাতে পানছড়ির লোগাং ইউনিয়নের অনিল পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ পিসিপির সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক বিপুল চাকমা, পিসিপির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সুনীল ত্রিপুরা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের নেতা লিটন চাকমা ও ইউপিডিএফের সদস্য রুহিন বিকাশ ত্রিপুরা।

চট্রলার কন্ঠকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইউপিডিএফের জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা। তিনি বলেন, মঙ্গলবার ওই এলাকায় গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের উদ্যোগে যুব সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। সম্মেলনে যোগ দিতে এই চার নেতা সেখানে অবস্থান করছিলেন। রাতে তাদের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার জন্য তিনি প্রতিপক্ষ ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) দায়ী করেছেন।

এ ঘটনায় আরো তিনজনকে অপহরণের অভিযোগ করেছেন অংগ্য মারমা। তারা হলেন ইউপিডিএফ সংগঠক নীতি দত্ত চাকমা, হরিকমল ত্রিপুরা ও সদস্য প্রকাশ ত্রিপুরা। এদিকে হত্যার প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে বিপুল চাকমার বাড়ি চেঙ্গী ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের করল্যাছড়ি বুদ্ধধন পাড়ায়। সুনীল ত্রিপুরার বাড়ি মাটিরাঙ্গা উপজেলার বড়নাল ইউনিয়নের সুরেন্দ্র রোয়াজা হেডম্যান পাড়ায়। লিটন চাকমার বাড়ি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের দ্রোনাচার্য্য কার্বারি পাড়ায়। রুহিন বিকাশ ত্রিপুরা পানছড়ির উল্টাছড়ি ইউনিয়নের পদ্মিনী পাড়ায়। ঘটনার প্রতিবাদে মাসব্যাপী পানছড়ি বাজার বয়কট, ১৮ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল–সন্ধ্যা সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি দিয়েছে ইউপিডিএফ।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, অনিল পাড়া এলাকার ছোট টিলার উপরে স্থানীয় বাসিন্দা অতুল চাকমার ঘর। তিনি সেখানে ছিলেন না। ঘরের বাইরে চারপাশে আমের বাগান। গত রাতে ঘটনার সময় ঘরের ভেতরে ইউপিডিএফের নেতা বিপুল চাকমাসহ অন্যরা সেখানে অবস্থান করছিলেন। রাত ১০টার পর তাদের ওপর হামলা হয়েছে। ঘরের ভেতরে বিপুল চাকমা ও লিটন চাকমার মরদেহ পড়ে আছে। ঘরের পেছনে রুহিন চাকমা এবং উঠানে সুনীল চাকমার মরদেহ পড়ে আছে। সুনীলের হাত পেছনে বাঁধা ছিল। ঘরের সামনে ২৩টি গুলির খোসা পড়েছিল।

নিহত বিপুল চাকমার কাকি গৌরি চাকমা বলেন, বিপুলকে রাত ১০টার গুলি করে হত্যা করা হয়। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা ভাগ্যধন চাকমা বলেন, পাহাড়ি পাহাড়ি ভাই ভাই। তাদেরকে এভাবে অন্যায়ভাবে কেন হত্যা করবে? আমরা এই ঘটনার বিচার চাইব।

হত্যাকাণ্ডের পর সেখানে উপস্থিত হন ইউপিডিএফের দুধকছড়া ইউনিটের সাংগঠনিক সম্পাদক সুবোদ চাকমা। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কালকে আমাদের যুব সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে যোগ দিতে আমাদের সহযোদ্ধা এখানে রাতযাপন করছিলেন। এ সময় ২০–২৫ জনের সশস্ত্র একটি গ্রুপ তাদের ওপর হামলা করে। সকালে আমরা ৪ সহযোদ্ধার মৃতদেহ পাই। তিনজনকে তারা নিয়ে গেছে। তাদের কী পরিণতি হয়েছে এখনো জানি না।

তিনি বলেন, পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত লাগিয়ে দিয়ে একটি পক্ষ সুবিধা নিতে চায়। ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার বিচার চাইব।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোগাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জয় কুমার চাকমা বলেন, গতকাল রাতে কে বা কারা ঘরটা ঘেরাও করে গুলি করে চারজনকে হত্যা করেছে। তিনজনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরিস্থিতি থমথমে। সাধারণ জনগণ ভয়ভীতির মধ্যে বসবাস করছে।

অন্যদিকে এ  হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) কেন্দ্রীয় সভাপতি শ্যামল চাকমা। তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল রয়েছে। তারা এই ঘটনা ঘটাতে পারে। সামনে নির্বাচন। আমরা এই ঘটনা কেন ঘটাব? আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত নই।

জানতে চাইলে এ বিষয়ে পানছড়ির থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিউল আজম বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে গেছি। বিকেল সাড়ে ৫টার পর চারজনের মৃতদেহ থানায় নিয়ে এসেছি। পরবর্তী যে আইনি কার্যক্রম তার প্রক্রিয়া চলছে।

ইউপিডিএফ যা বলল : ঘটনার পর গতকাল বিকালে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে ইউপিডিএফ। বিবৃতিতে চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় ইউপিডিএফ ও সহযোগী সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ, হরতাল, সড়ক অবরোধ ও বাজার বয়কটসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রবি শংকর চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি জিকো ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি কণিকা দেওয়ান, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি অংকন চাকমা এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

নেতৃবৃন্দ বলেন, খুন, গুম করে জনগণের ন্যায্য আন্দোলন দমন করা যায় না। অতীতে অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করার পরও ইউপিডিএফকে আন্দোলন থেকে বিচ্যুত করা যায়নি। ভবিষ্যতেও যাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে অরাজকতা সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এলাকায় এলাকায় গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।

প্রতিবাদে কর্মসূচি : হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার, শাস্তি এবং ইউপিডিএফকে (গণতান্ত্রিক) ভেঙে দেওয়ার দাবিতে ইউপিডিএফ ও সহযোগী সংগঠনগুলো কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ১৩ থেকে ১৫ ডিসেম্বর প্রতিবাদ সমাবেশ ও শোক সভার ডাক দিয়েছে সংগঠনটি। ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাস পানছড়ি বাজার বয়কটের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ১৭ ডিসেম্বর পানছড়ি উপজেলায় সাধারণ ধর্মঘট ও ১৮ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল–সন্ধ্যা সড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn