ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৪ ১:২২ অপরাহ্ণ

টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হতে “বিচ্ছু” শামসুর তদবির

নিজস্ব প্রতিবেদক।

চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে টানা তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন সামশুল হক চৌধুরী। ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপও। তবে, এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েও বঞ্চিত হয়েছেন তিনি। ওই আসনের নৌকার ‘মাঝি’ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়ে ‘ভরাডুবি’  হয় সামশুর। তবে আশা ছাড়েননি তার সমর্থকরা। এলাকায় গুঞ্জন উঠেছে, টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করা হচ্ছে তাকে।

স্থানীয় অনেকে বলছেন, সদ্য বিদায়ী ‘দাপুটে হুইপ’ সামশুল হক চৌধুরী এবারের নির্বাচনে নৌকাবঞ্চিত হয়ে ব্যাপক ‘রাজনৈতিক ক্ষতির’ মুখে পড়েছেন। তাঁর এমপি থাকাকালীন সময়ের ‘বন্ধু-নেতাকর্মী’ মুহূর্তেই তাঁর সঙ্গ ছেড়ে চলে যান।

nagad

সামশু আশা করেছিলেন, দল মনোনয়ন না দিলেও স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনী দৌড়ে পটিয়ার বেশিরভাগ নেতাকর্মী তাঁর সঙ্গেই থাকবেন। অন্তত তার কাছ থেকে ‘সুবিধাভোগী’ নেতাকর্মীরা তাকে ছেড়ে যাবেন না! নির্বাচনী মাঠে নেমে বুঝলেন, সবই মিথ্যা। উল্টো মাঠে ওই ‘সুবিধাভোগীদের’ হাতেই লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়ে তাকে। শুধু সামশু নন, তার পরিবারও হেনস্থার শিকার হন। ফলশ্রুতিতে নির্বাচনে ভরাডুবি হয় তার। এমন অবস্থায় সামশুল হক চৌধুরী ‘অস্তিত্ব রক্ষায়’ কিছু একটা তো করবেন—এটাই স্বাভাবিক! আপাতত আসন্ন মন্ত্রিসভায় ঠাঁই নিতে তার চেষ্টা চালানো মোটেও অবিশ্বাস্য নয়। এক্ষেত্রে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

একটি সূত্রের দাবি, নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পেলেও প্রধানমন্ত্রীর ‘পছন্দের’ তালিকায় রয়েছেন সামশুল হক চৌধুরী। যেহেতু তাকে এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়নি এবং স্বতন্ত্র লড়েও নির্বাচনে এমপি পদ ধরে রাখতে পারেননি। তাই তাকে সান্তনাস্বরূপ করা হতে পারে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে— এমন কথা ভেসে বেড়াচ্ছে পটিয়াজুড়ে। এছাড়া তিনি নিজেও মন্ত্রী হতে ‘তদবির’ করছেন উপরমহলে— চাউড় হয়েছে এমন কথাও।

সামশুলকে মন্ত্রী করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন  ‘এটি সম্পূর্ণ ভুয়া। যিনি পরপর তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েও তাঁর এলাকায় প্রচারণা চালাতে গিয়ে জনগণের রোষের শিকার হয়েছেন; তিনি কখনো মন্ত্রী হতে পারবেন না। তিনি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছেন। নির্বাচনের দিনেও তাকে জনগণ প্রতিরোধ করেছে।’

মফিজ বলেন, ‘বর্তমানে যাকে জনগণ এমপি বানিয়েছেন তিনি ফ্রেশ মানুষ। তাঁর বিরুদ্ধে কোনোপ্রকার অভিযোগ নেই। তিনি সফল উপজেলা চেয়ারম্যানও ছিলেন।’

এদিকে নির্বাচনে হেরে ‘কোণঠাসা’ হয়ে পড়া বিদায়ী এই হুইপের ছেলে ও তার প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারীর দায়িত্বে থাকা নাজমুল করিম চৌধুরী শারুণ মন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ‘বিষয়টি সত্য নয়’ জানিয়ে উল্টো শারুন বলেন, ‘আমি তো ফেসবুকে দেখেছি, নতুন সংসদ সদস্য মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরীকেই মন্ত্রী করা হচ্ছে!’

মুঠোফোনে সিভয়েসকে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুণ বলেন, ‘আমার বাবা বা আমরা কেউ কারো সাথে ওই বিষয়ে কোনো কথা বলিনি, তদবিরও করিনি। আমি এসব নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না। কারণ আমরা নির্বাচনে সফল হতে পারিনি।’

এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ‘পুরো দেশে নির্বাচন কেমন হয়েছে আর পটিয়ায় কেমন হয়েছে সেটাতো আপনারা দেখেছেন। সকাল ১১টার পর আমাদের সব এজেন্ট কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। একতরফা ভোট কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পটিয়ায় আসলে কোনো নির্বাচনই হয়নি।’

নির্বাচনে দলীয় নেতাকর্মীদের সমর্থন পুরোপুরিভাবে পেয়েছিলেন কীনা—প্রশ্নের জবাবে শারুণ বলেন, ‘শতভাগ পেয়েছি। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আমাদের দারুণ সাপোর্ট দিয়েছেন। নাহলে আমরা টিকে থাকতে পারতাম না। আমাদের জন্য তারা প্রাণ খুলে কাজ করেছেন। সাধারণ মানুষের অবিরাম ভালোবাসা পেয়েছি।’

তাহলে নৌকার প্রার্থী মোতাহেরুল কার সমর্থন পেয়েছিলেন?-এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমুল করিম চট্টলার কন্ঠকে  বলেন, ‘তিনি নৌকা প্রতীক পেয়েছেন তাই তাকে তৃণমূল নেতাকর্মীরা সমর্থন দিয়েছে। তবে দলীয় নেতাকর্মীদের বাইরে কোনো দল বা গোষ্ঠী সাপোর্ট দিয়েছে কিনা তা আমি সুনির্দিষ্টভাবে জানি না।’

অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘ নির্বাচন ঘিরে আমাদের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন এখনো। অনেকে বাড়িঘরে যেতে পারছেন না। তাদেরকে ভয় দেখানো হচ্ছে।’

শারুণ বলেন, ‘আমাদের নির্বাচন শেষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাও শেষ। আমরা পটিয়ায় কখনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করিনি। গত ১৫ বছর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আমাদের মধ্যে ছিল। একজন আরেকজনকে কো-অপারেট করেছি। তফসিল ঘোষণার আগেও আমরা একসাথে ছিলাম। আমাদের মধ্যে কখনো দ্বিধা-বিভক্তি ছিল না।’

সরেজমিন দেখা যায়, পরপর তিনবার চট্টগ্রাম-১২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সামশুল হক চৌধুরী এবার মনোনয়ন না পেয়ে মাঠে চরম ‘কোণঠাসা’ হয়ে পড়েন। নৌকা প্রতীক না পাওয়ায় বিদায়ী এই হুইপের সঙ্গ ছেড়ে দেন অনেক নেতাকর্মী। এছাড়া, একাধিকবার হামলা ও জনরোষের শিকারও হয়েছেন নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে।

নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে কেন্দ্রে সামশুলকে পড়তে হয়েছে ‘অপ্রীতিকর’ পরিস্থিতিতে। এখানে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী ১ লাখ ২০ হাজার ৩১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। ঈগল প্রতীকে নির্বাচন করা স্বতন্ত্র প্রার্থী সামশুল হক চৌধুরী তাঁর কাছে হেরেছেন ৮৫ হাজার ৭৩ ভোটে।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn