এপ্রিল ১৪, ২০২৪ ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

পদক নিয়ে চসিকের তামাশা

মিরাজ হোসেন শিমুল, চট্রলার কন্ঠ।

ভাষা আন্দোলনে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ মরণোত্তর একুশে সম্মাননা স্মারকের জন্য ‘ঢাকঢোল’ পিটিয়ে ভাষাসৈনিক অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদের নাম ঘোষণা করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। পদক গ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানানো হয় তাঁর পরিবারকেও। তবে অনুষ্ঠানের আগ মুহূর্তে এসে তাঁর পদক স্থগিত ঘোষণা করে সংস্থাটি।

চীনপন্থী বাম রাজনীতি, বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণ দেখিয়ে তাঁকে নিয়ে ওঠা আপত্তিতে আটকে দেওয়া হয়েছে তাঁর পদক। ফলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হলো তাঁর পরিবারকে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে সমালোচনা।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত অধ্যাপক আসহাব উদ্দীনের নাতি বাঁশখালী উপকূলীয় কলেজের উপাধ্যক্ষ বশির উদ্দীন কনককে পদক প্রদানের বিষয়টি জানান চসিকের উপ-সচিব আশেক রসূল টিপু।

কিন্তু পদক প্রদানের আগের দিন বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) একই কর্মকর্তা তাকে মুঠোফোনে ক্ষুদেবার্তা দিয়ে জানান, আসহাব উদ্দিনকে পদক দেওয়া হচ্ছে না, স্থগিত করা হয়েছে।

জানা গেছে, চীনপন্থী বাম রাজনীতি করা আসহাব উদ্দীন বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের কট্টর সমালোচক হওয়ায় এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তাঁর পদক স্থগিত করা হয়েছে।

বশির উদ্দীন কনক বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে আমাকে প্রথমে মেসেজ দিয়ে এবং পরে ফোন করে পদক দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের পদক গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে আবার মেসেজ দিয়ে জানানো হয়েছে, পদক স্থগিত করা হয়েছে। তবে লিখিতভাবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি।’

যাঁরা পদক পাবেন তাঁদের মনোনীত করতে চসিক গঠিত জুরিবোর্ডের সভাপতি হলেন পেশাজীবী নেতা ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক আসহাব উদ্দীনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন একজন সাংবাদিক। অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদ চীনপন্থী বাম রাজনীতি করতেন। বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের কট্টর সমালোচক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ওনার ভূমিকা নিয়ে কেউ কেউ আপত্তি তুলেছেন। আমরা যখন বিষয়টি মেয়র মহোদয়কে জানাই, উনি বিতর্ক ওঠে এমন কাউকে না রাখার জন্য বলেন।’

‘ওনার পরিবারকে জানানোর পর আবার প্রত্যাহারের বিষয়টি সঠিক হয়নি। পরিবারকে জানানো উচিত হয়নি। এটি ওনার পরিবারের জন্য অবশ্যই বিব্রতকর।’— বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জুরিবোর্ডের কার্যক্রম দেখভাল করেন চসিকের শিক্ষা বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি ড. নিছার উদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বলেন, ‘জুরি বোর্ডের কার্যক্রমে আমরা কখনো হস্তক্ষেপ করি না। ওনারাই অধ্যাপক আসহাব উদ্দিনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তীতে রিভিউ করার সময় সেটি বাদ পড়ে। জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তে যদি কোনো বিতর্ক বা সমালোচনা ওঠে, তখন সিটি করপোরেশনকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।’

এদিকে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব মহসীন কাজী ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘৫৪’র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, ভাষাসৈনিক, সাহিত্যিক-সমালোচক, ইংরেজির জাঁদরেল শিক্ষক প্রফেসর আসহাব উদ্দীন আহমেদকে ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মরণোত্তর একুশে পদক প্রদানের জন্য মনোনীত করে। আজ শুক্রবার শিরীষতলার বইমেলার আলোচনা মঞ্চ থেকে পদক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা। কিন্তু গতরাতে হঠাৎ করে চসিক থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় তার পদক প্রক্রিয়া ‘স্থগিত’।’’

মহসীন কাজী আরও উল্লেখ করেন, ‘‘ঘটনাটি শোনার পর একুশে মেলা কমিটির অন্যতম কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনা সত্য। আসহাব উদ্দীন আহমেদের নাম ঘোষণায় আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড এবং একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা থেকে আপত্তি এসেছে- তাই ওনারটা স্থগিতের সিদ্ধান্ত হয়েছে’। তাৎক্ষণিক ওনাকে বললাম, আপনি যা বলছেন তা ঠিক মনে হচ্ছে না। আপনি মনে হয় জানেন না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে কয়েক বছর আগে বরেণ্য গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার স্বাধীনতা পদক নিয়েছেন। তিনি ছিলেন প্রকাশ্যে বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। নাট্যকার আমজাদ হোসেন ও অভিনেতা আহমেদ শরীফ বিএনপি করতেন। অসুস্থতার সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে তারা মোটা অংকের সহায়তা পেয়েছিলেন।’’

মহসীন কাজী লিখেছেন, ‘চসিকের আরেক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, তাকে এ বিষয়ে না জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

‘তবে ওনাকে নির্বাচিত করার পর, হঠাৎ স্থগিতের সিদ্ধান্ত দেওয়া কোনোভাবে ঠিক হয়নি।’- যোগ করেন মহসীন।

আসহাব উদ্দীন আহমেদ একজন কড়া প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন। প্রায় সারাজীবন কেটেছে জেল-জুলুম, হুলিয়ার মধ্য দিয়ে। ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যিক এবং রাজনৈতিক সমালোচক হিসেবে ছিলেন পাঠকপ্রিয়। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলো এখনো আলোচিত।

চসিক আসহাব উদ্দীনের মত ব্যক্তিত্বকে নিয়ে যে পদক-কাণ্ড করেছে, তা সত্যিই ‘অমানবিক, ফাজলামো ও মশকরা’।-এমনটা মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।

উল্লেখ্য, এবার চসিকের একুশে স্মারক সম্মাননা পদক পাচ্ছেন- মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী (মরণোত্তর), শিল্প উন্নয়ন ও সমাজসেবায় মো. নাছির উদ্দিন (মরণোত্তর), চিকিৎসায় প্রফেসর ডা. মো. গোফরানুল হক, নাট্যকলায় শিশির দত্ত, শিক্ষায় প্রফেসর প্রদীপ চক্রবর্তী, সাংবাদিকতায় জসীম চৌধুরী সবুজ, সংবাদপত্র শিল্পের বিকাশ ও মানোন্নয়নে রুশো মাহমুদ, সঙ্গীতে শ্রেয়সী রায়, ক্রীড়ায় জাকির হোসেন লুলু, চলচ্চিত্র নির্মাণ ও গবেষণায় (স্বল্পদৈর্ঘ্য) শৈবাল চৌধুরী এবং সাহিত্যে শামসুল আরেফীন, ড. শামসুদ্দীন শিশির, আবসার হাবীব, ভাগ্যধন বড়ুয়া, অরুণ শীল ও শিবুকান্তি দাশ।

গতকয়াল শুক্রবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নগরের সিআরবি শিরীষতলা মাঠে বইমেলায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে এ সম্মাননা ও পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn